Community post
পুরোনো ডেরা
মগবাজার ছেড়ে নতুন এলাকায় ডেরা বানাতে যাচ্ছি। বিয়ের পর ডক্টর গলিতে আমাদের ছোট্ট গুছানো বাসা। প্রথম বাসা বলে হয়তো ছেড়ে যেতে বেশি মায়া লাগছে। সাথে আপু আর চাচ্চুর থেকেও বেশ দূরে চলে যাচ্ছি। একদম একা, নতুন এক জায়গায়।

দুই বছর আগে ছোট এই বাসাটা ছিমছাম করে নিজের মতন গুছিয়ে ছিলাম। গাছ আর আঁকাআকি দিয়ে হালকা করে সাজায় রাখতাম। পুরোনো বাসা হওয়ায় বেশ বড় জানালা আর বারান্দা ছিল। মন মতন গাছ লাগাতে পারতাম।



এখানে যে আশপাশে প্রতিবেশিদের সাথে খুব যে খাতির ছিল তা না। টিপিক্যাল ঢাকায় যেমন হয় ওরকমই। হাই হেলো সম্পর্ক। কিন্তু তাও খারাপ লাগছে। জানালা খুললেই যাদের বাসা দেখা যেতো, ওরাও বাসা ছেড়ে দিয়েছে। ওদের বাড়ির ছোট মেয়েটার নাম নূর ছিল। সারাদিন নূর আর ওর বড় ভাই লেগে থাকতো। আমাদের বাসা থেকে ওদের সব কথাই শোনা যেতো। ব্যাথরুমে ঢুকেই কিচ্ছুক্ষণ পর মেয়েটা বলতো "আম্মু...... পানি শেষ! মটর ছাড়তে বলো!!!"
জানালা দিয়ে আন্টি আমাকে দেখলেই গল্প করার জন্য আমাকে ডাকতো। সুইট ছিল। কিছু মানুষ যেমন নিজে থেকেই সব কথা বলে যায়, ওরকম ছিল। এক আড্ডায় ফুল ফ্যামিলি হিস্ট্রি জেনে যাওয়া যায়! আন্টি প্রতিদিন রান্না করতো। তার মশলা কসানোর ঝাঝে আমার ঘর ভরে থাকতো। এই ছোট্ট পরিবারটাকে মিস করবো।
নূরদেরই পাশের বিল্ডিংয়ে এক গিটারিস্ট ভাই থাকতো। প্রায়ই লাউড স্পিকারে গান ছেড়ে দিতো। বয়স হয়তো আমাদের আশপাশেই হবে। কারণ তার সব প্লে লিস্টের গানই আমাদের পছন্দের ছিল। তার সবথেকে পছন্দের গান ছিল "আদাত"। এটাই সবচেয়ে বেশি বাজাতো! আর কয়দিন পর পর বন্ধুরা মিলে জ্যামিং করতো। মন টন খারাপ থাকলে ওনাদের গান শুনে মুড ভালো হয়ে যেতো। বাবু হওয়ার পর এবার এসে আর তার গান শুনছি না। নাম না জানা এই ভাইটাকেও মিস করবো।

খাওয়া দাওয়া শেয়ার করার জন্য ৩/৪ টা সঙ্গী বানিয়েছিলাম। বেডরুমের জানালার নিচে কয়েকটা বিড়াল থাকতো। একটা লেজ মোটা সাদা, আরেকটার এক পা ভাংগা।
ভাত খাওয়া শেষে কাটা, হাড্ডি দিতাম ওদের। আমার জানালা খোলার আওয়াজেই দৌড়ায় আসতো। খাবারে ভাগ বসাতে গলায় বেল্ট পড়া একটা abounded বিড়ালও আসতো। ওকে দেখে বেশি মায়া হতো। পালা বিড়াল যখন ফেলে দিয়ে যায় তখন খারাপ লাগে।
ত্বহা সামুদ্রিক মাছ প্রায় আনতো। এর মধ্যে টুনা মাছের মাথা খেতে পারতাম না। ওগুলা সিদ্ধ করে ওদের দিতাম। কি যে মজা করে খেতো! আমার খাওয়া দেয়া দেখে নতুন এক বিড়ালের বাচ্চা তিন তালা বেয়ে বাসার দরজার সামনে এসে বসে থাকতো। কি এক অবস্থা। ওকে নিচে নিয়ে গিয়ে খাবার দিয়ে আসতাম। কোন মাছ মাংস একটু পুরানো হয়ে গেলেও ওদের দিতাম।

বড় বড় বিল্ডিংয়ের জন্য রোদ এদিকে খুব কম সময়ের জন্য আসতো। ওইটুকু সময়েই রোদের মধ্যে চেগায়ে ওরা শুয়ে থাকতো। হালকা বাতাসে গায়ের লোমগুলা একটু উড়তো। দেখতেই ভাল লাগতো৷
আমি আসার পর আগের একটা বিড়ালকেও আর পাই নাই। ত্বহা বললো আগের কোন বিড়ালই এখন আর আসে না। গতকাল দেখি নতুন দুইটা বিড়ালের বাচ্চা ঘুর ঘুর করছে। আমাদের মতনই পুরনো বিড়ালগুলা স্থানান্তর হয়ে নতুনরা এসে জায়গা করে নিয়েছে। I'll miss my old cats too!
যেই বাসাটায় আমরা থাকতাম এর এন্ট্রি পয়েন্টটা খুব সুন্দর গুছানো। বাসার সামনে একটা বড় বাগান বিলাস। প্রায় সারা বছরই গোলাপি ফুল ফুটে থাকে। বাড়ি ওয়ালা আন্টি বাসার সামনে ছোট ফ্রি স্পেসে অনেক অনেক পাতাবাহার গাছ লাগিয়ে রেখেছে। কেচিগেটের ভেতরেও অনেক শোপিস দিয়ে জায়গাটা সাজানো। বেশিরভাগই মাটির। জায়গাটায় দাঁড়িয়ে সব ভালো মতন দেখতেও মিনিট পাচেক সময় লেগে যাবে। অনেকের কাছে কিছুটা ক্রিপিও লাগে। টিকলি এসে বলেছিল উনি voodoo practice করে না তো? হেহে। আমার কাছে তেমন কিছু মনে হয় না। বাড়িয়াওয়ালা আন্টি বয়স্ক। হাল্কা ক্যাটকেটে আর কিপটা স্বভাবের। মটর ছাড়া আর বুয়া নিয়ে বেশ ঝামেলাও করেছে আমাদের সাথে। কিন্তু যেদিন থেকে আমার বাবু হবে শুনেছে সেদিন থেকে তার আমার সাথে তার ব্যবহার একদম বদলায় গেলো। দেখা হলেই এত আদর আর যত্ন করতো। দোয়া পড়ে ফু দিয়ে দিতো। বাবু হওয়ার পর বাবুকে কত আদর। একটু খারুস হলেও আমার এই প্রথম বাড়িওয়ালাটাকে মিস করবো।
সবশেষে বলবো আপুর কথা। সারা দিন অফিস করে ফিরে বাচ্চাদের পড়ানো শেষ করে রান্না করে। ভাল মন্দ রান্না করলে আমাদের ডাক পরে। বাবুদের দেখার কেউ না থাকলে আমার বাসায় মাঝে মধ্যে দিয়ে যেতে পারতো।
এখন ইচ্ছা করলেই আর হেঁটে আপুর বাসায় যাওয়া হবে না। এটা ভাবলেই সবচেয়ে বেশি কষ্ট লাগে। যদিও বলে আসছি কিছু হলেই বাবুকে নিয়ে রিক্সা করে চলে আসবো, কিন্তু আদোও পারবো কিনা কে জানে! I'll miss them the most!


দেড় বছরের মধ্যে এলাকার দোকানদার, সবজির ভ্যানআলারা, ফল মামা, pixel এর সেলস ভাই সবাইকেই মিস করা হবে৷ এলাকার কুকুরগুলার বড় হওয়া আর দেখা হবে না।

এখন যেখানে যাচ্ছি সেটা বিশাল এলাকা, কমার্সিয়াল মানুষজন। আশপাশের মানুষকে কতটা চেনার সুযোগ হবে জানিনা। তারা আমাদের মনেও রাখবে কিনা জানিনা। Still, hoping for the best!
Replies (0)
Conversation
No replies yet
Replies will appear here as people join the conversation.